সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বুদ্ধিজীবী

শিবরামের লেখা পড়ে যে অনাবিল আনন্দ পাই, তা অন্য কোনো লেখা পড়ে পাই না। ভদ্রলোক কোনো দিন লেখক হতে চাননি। “রিকশা টানার থেকে কলম টানা কঠিন,” লিখেছেন তিনি। নিজেকে কখনো বুদ্ধিজীবী বলতেন না, বলতেন শ্রমজীবী। আজকের দিনে অবশ্য সবাই বুদ্ধিজীবী। যাদের বুদ্ধি নেই, তারাই বরং সবচেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী।

বছর পনেরো আগের কথা। তখনও আমি অবিবাহিত, অনেকটাই মুক্ত বিহঙ্গসম।  ট্রেনে করে মুম্বাই থেকে হাওড়া যাচ্ছিলুম, কোন্নগরের বাড়িতে। তখনও মুম্বাই ঠিক আমার বাড়ি হয়ে ওঠেনি। আমার সহযাত্রী ছিলেন স্কুলের পাঠ্যবইয়ের একজন লেখক, যতদূর মনে পড়ছে ফিজিক্সের। কলকাতায় তখন পাবলিশার্স গিল্ডের একটি বার্ষিক সম্মেলন হত, শহরের যে কোনো একটি পাঁচতারা হোটেলে। ওনার কাছ থেকেই সম্মেলনের ব্যাপারটা প্রথমবার শুনেছিলাম। এখনও সেসব হয় কিনা, তার খোঁজ রাখা হয়নি। সেই সম্মেলনে সমস্ত লেখককে, গল্প থেকে ফিজিক্স লিখিয়ে সবাইকে, আমন্ত্রণ জানানো হত। ভদ্রলোক কোনো ভনিতা না করেই বললেন, “আমি তো নিজের ক্ষমতায় কোনো দিন ফাইভ স্টার হোটেলে যেতে পারব না। তাই এই আমন্ত্রণ আমি উপেক্ষা করতে পারি না।”

সেই রকমই একবার একটি বার্ষিক পার্টিতে অতিথিদের মধ্যে ছিলেন এক নামী টলিউড সেলিব্রিটি। তিনি যথারীতি বক্তৃতা দিতে উঠলেন এবং কিছুক্ষণ আবোলতাবোল বলার পর শেষ করলেন এই বলে, “আমরা যারা বুদ্ধিজীবী…”
ভদ্রলোক সে সম্মেলনের বর্ণনা দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ছানাবড়া করে বললেন, “বুঝুন দাদা, সে সেলিব্রিটিও নাকি বুদ্ধিজীবী! জীবী বুঝি, বুদ্ধি কোথায়? আমরা কোথায় গিয়ে ঠেকেছি, বুঝতে পারছেন?”

সেদিন খুব হাসি পেয়েছিল। তিনি কথাটা যেভাবে বলেছিলেন, সেটার জন্যই। সেলিব্রিটি বুদ্ধিজীবী কিনা, সে ব্যাপারে আমার কোনো মতামত তখনও ছিল না, আজও তেমন ভাবে নেই। বা হয়তো আছে এখন, তাই লিখছি।

ভেবে দেখলে, শিবরাম যদি নিজেকে শ্রমজীবী বলতে পারেন, তবে বুদ্ধিজীবী কে? আর সেলিব্রিটিরা কতটা আত্মবিস্মৃত হয়ে নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলতে পারেন বা কোনো ফুটবল তারকা কলকাতায় আসলে তাকে ঢেকে রেখে অন্যদের তাকে দেখা অবধি থেকে বঞ্চিত করতে পারেন

এইটুকুই শুধু বলার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শুভ নববর্ষ

আজকে শুভ নববর্ষ। সকালের শুরুটা বেশ ছিল। ক্রিকেট খেললাম সাড়ে ছটা থেকে। দৌড়ে দৌড়ে অনেক রান নিলাম , একটা ক্যাচ নিয়ে ম্যাচ জেতালাম। বন্ধুদের পিঠ চাপড়ানো উপভোগ করলাম , বাবা মা , শ্বশুর শাশুড়ি কে ফোন করে নববর্ষ জানালাম। এখন বাড়ি এসে নিজের প্রিয় ম্যাক নিয়ে বসেছি। এভাবেই কেটে যাক জীবনটা , মন্দ নয়।   ওদিকে ইরান আবার ইসরাইল কে আক্রমণ করেছে। কে ভুল , কে ঠিক জানিনা। শুধু মাঝেমধ্যে মনে হয় মানুষই পারে   সুখে থাকতে ভূতের কিল খেতে। পৃথিবীটা এবার কোনদিকে ঘুরে যাবে কে জানে। অনেক যুদ্ধবাজ দেশ ওত পেতে আছে , তাদের কাছে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার যোদ্ধারা তো শিশু।   ওদিকে আবার গিন্নির মন মেজাজ খুব খারাপ। পরীক্ষায় বাজে রেজাল্ট করে আর পড়াশোনার উচ্চকাঙ্খ পূর্ণ হবে না বলে মন তেতো করে বসে আছে। আমার কিছু করার নেই। যেটায় কিছু করতে পারব না , সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবব না। আমি আমার মতো থাকব ঠিক করেছি। জীবনে কত কিছু জানার , দেখার , বোঝার। এভাবে মুখ লটকে থাকলে তাতে...

তোমাদের জন্য মেমসাহেব, সাহেব।

ইংরেজিতে লিখব না বাংলা? এই ভাবতে ভাবতেই আমার সময় কেটে গেল, লেখা আর হয়ে উঠল না। কোন কিছু শুরু করার আগে উদ্দেশ্যটা ঠিক হওয়া জরুরি। আমার প্রস্তুতি ঠিক ছিল না।  এখন ভাবছি লেখাটা জরুরি, ভাষাটা নয়। আমি যেহেতু দুটো ভাষা জানি, আমি দুটোতেই লিখব। যেটা বাংলায় লিখলে ভাল হয়, সেটা বাংলায় লিখব, যেটা ইংরেজিতে স্বাভাবিক, সেটা ইংরেজিতে লিখব। বাংলায় লিখতে পারলে সব থেকে ভাল হয়, সেটাই আমার মাতৃভাষা, কিন্তু ইংরেজি সহজতর। সেটা হয়ত আমার দুই দশকের ইংরেজি লিখে কাজ করার ফল।  আমি দুটি ভাষাতেই সাহিত্যমানের লেখা লিখতে পারব না। কিন্তু লিখতে ভালবাসি। সব  শেষে একটি ইবুক বানিয়ে আমাজনে বা গুগুলে ছেড়ে দেবো। সেটা অবশ্য এই চাকরিটা ছাড়ার পরেই সম্ভব। যখন সময় আসবে, তখন আমার লেখাগুলি এই বিশাল আন্তরজালে ঠাই পাবে। তার আগে লেখাগুলি তৈরি করা দরকার। কেউ পড়বে না হয়ত, কিন্তু আমার কন্যা শ্রাবস্তি আর ভাগ্নে প্রভেক পড়লেই যথেষ্ট। আমি যখন থাকব না, এই লেখাগুলি হয়ত ওদের একটু শান্তি দেবে। অমরত্বের ইচ্ছে আমার নেই, তবে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কথা বলতে পারার লোভ সংবরণ করা কঠিন।  হয়ত এই হাবিজাবি লেখাগুলি ভবিষ্যতের প্রজন্মের কেউ পড়ব...

বাংলা ও বাঙালি

বাংলায় লিখবো কি লিখবো না, পারব কিনা, এসব ভাবতে ভাবতে ইংরেজিতে লেখা শুরু করলাম। তখনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল।  শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী মহাশয়ের ইউটিউব চ্যানেলে বাঙালি ও বাংলা ভাষার সংকট নিয়ে একটি লেকচার শুনলাম। কত মানুষের সাধনা ও সংগ্রামের ফল আমাদের এই বাংলা ভাষা। আমার মনে একটি দ্বন্দ্ব চলে আসছিল, আমার ভাষা বোধকরি সাহিত্য-উপযোগী নয়। তাহলে সাহিত্য সৃষ্টি করব কী করে। ওনার বক্তৃতা শুনে বুঝলাম এটি আমার মনের অযথা বাধা, এতে কোনও সার নেই। এই স্বরোপিত বাধা শুধু মায়ার খেলা। কত মানুষের কত রকম বাংলা। আজ যে ভাষায় লিখছি বা কথা বলছি, সেটিই কি খাঁটি? আমি যে ভাষায় লিখব সেটিই আমার ভাষা। এত ভাববার কি আছে। তাই, আমার জানা ভাষাতেই আমি আমার মতো করে সাহিত্য রচনা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সবটাই হাতে লিখবো আগে। পরে টাইপ করে নেওয়া যাবে, যেমন এখন করছি। আর হ্যাঁ, নিজের ভাষায় লিখছি, নিজের সাথে কথা বলার মতো করেই। সেখানে তাড়াহুড়ো চলবে না। যখন ইচ্ছে হবে লিখব, ইচ্ছে না হলে লিখব না। তবে লেখা থামাবো না। লেখটা শুরু করেছিলাম একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে বলে। সেটায় আসা  যাক। ভাদুড়ী মশাই তার...